August 5, 2026
মাথার ওপর শুধু আইসক্রিমের বাক্স ছিল না, ছিল একটা সংসার
- আমার একটা স্বভাব আছে।
কোথাও ডেলিভারি শেষ হলে তাড়াহুড়ো করে ফিরে আসি না। একটু নিরিবিলি জায়গা খুঁজি। বসে থাকি। মানুষ দেখি। বাতাস দেখি। পৃথিবীকে দেখি।
আজও তাই।
Delicious Cuisine থেকে একটি কেক নিয়ে ভান্নারার সোনিয়া আপুর কাছে পৌঁছে দিলাম। কাজ শেষ করে চলে এলাম ধোপাচালা রেললাইনের পাশে। রেললাইন আমার কাছে অদ্ভুত একটা জায়গা। এখানে বসলে মনে হয়, পৃথিবীর সব গল্প যেন একদিন না একদিন এই লোহার পথ ধরে হেঁটে যায়।
সেখানেই দেখা হলো একজন বাবার সঙ্গে।
মাথায় কাঠের একটি আইসক্রিমের বাক্স। রোদে পোড়া মুখ। ক্লান্ত চোখ। কিন্তু চোখের গভীরে এখনো হার না মানা একরাশ আলো।
একটা আইসক্রিম কিনলাম। খেতে খেতে গল্প শুরু হলো।
জানলাম, তাঁর বাড়ি সিরাজগঞ্জ।
প্রতিদিন এই ভারী বাক্সটা মাথায় নিয়ে চল্লিশ কিলোমিটারেরও বেশি পথ হাঁটেন। রোদ, বৃষ্টি, ধুলো—কোনোটাই তাঁর ছুটি নয়।
হঠাৎ মনে হলো—
ওই বাক্সটা শুধু আইসক্রিমে ভরা নয়; ওটার ভেতরে একটা পরিবারের দুপুরের ভাত, সন্তানের পড়ার খাতা, স্ত্রীর ওষুধ আর আগামী দিনের বেঁচে থাকার আশা গুছিয়ে রাখা আছে।
আমরা সিনেমার পর্দায় নায়ক খুঁজি।
সোশ্যাল মিডিয়ায় অনুপ্রেরণার গল্প খুঁজি।
কিন্তু আসল নায়করা কোনো ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান না।
তাঁদের ঘাম শুকিয়ে যায় রোদের তাপে। তাঁদের হাতের রেখা মুছে যায় পরিশ্রমে। তাঁদের গল্প লেখা থাকে না কোনো বইয়ে—লেখা থাকে সন্তানের মুখের হাসিতে।
তিনি বললেন, তাঁর ছেলে আছে।
ছেলের বিয়ে দিয়েছেন।
সেদিন বুঝলাম—
একজন বাবা আসলে সন্তানকে বড় করেন না; নিজের যৌবনটাকে আস্তে আস্তে বিক্রি করে সন্তানের ভবিষ্যৎ কিনে দেন।
লোকটা যখন আবার মাথায় বাক্সটা তুলে নিলেন, আমার মনে হলো—
ওটা কোনো আইসক্রিমের বাক্স নয়।
ওটা যেন এক অদৃশ্য পাহাড়, যা একজন বাবা সারাজীবন মাথায় বহন করেন।
ট্রেনের লাইন দুটি অনেক দূরে গিয়ে এক হয়ে গেছে বলে মনে হয়।
ঠিক তেমনি বাবার কষ্ট আর ভালোবাসাও দূর থেকে আলাদা বোঝা যায় না। বয়স বাড়লে, জীবন শেখালে, একসময় বুঝি—দুটো আসলে একই পথের দুই নাম।
ফিরে আসার সময় আইসক্রিমটা শেষ হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু মানুষের গল্পটা রয়ে গেল।
আজও মনে হয়—
পৃথিবীর সবচেয়ে ঠান্ডা জিনিসটা হয়তো তাঁর আইসক্রিম ছিল, কিন্তু সবচেয়ে উষ্ণ জিনিসটা ছিল সেই বাবার বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখা সন্তানের জন্য ভালোবাসা।
বেঁচে থাক পৃথিবীর সব বাবা।
যাঁরা কোনো রাজমুকুট পরেন না, তবু প্রতিটি সন্তানের হৃদয়ে অদৃশ্য এক রাজ্য শাসন করেন।
বাবা আসলে কোনো সম্পর্কের নাম নয়; বাবা এক নীরব মহাকাব্য।
যে মহাকাব্যের প্রতিটি পৃষ্ঠা লেখা হয় ঘামে, ক্লান্তিতে, না-বলা দীর্ঘশ্বাসে আর নিঃশর্ত ভালোবাসায়।
পৃথিবীর সব বন একসঙ্গে যত অক্সিজেন দেয়, তার চেয়েও বেশি জীবন একজন বাবা তাঁর আত্মত্যাগ দিয়ে সন্তানের ভেতর বাঁচিয়ে রাখেন।
বৃক্ষ নিজের ফল বিলিয়ে দেয়, ছায়া দেয়, অক্সিজেন দেয়।
আর বাবা…
বাবা নিজের জীবনটাই বিলিয়ে দেন।
পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের মৃত্যুর খবর একদিন সংবাদপত্রে ছাপা হবে।
কিন্তু একজন বাবার মৃত্যুর খবর কখনো কাগজে পুরোপুরি লেখা যায় না।
কারণ একজন বাবা মারা গেলে শুধু একজন মানুষ চলে যান না—একটি ছায়া সরে যায়, একটি দোয়া থেমে যায়, একটি আশ্রয় নীরবে ভেঙে পড়ে।
আজ হঠাৎ খুব বলতে ইচ্ছে করছে—
“বাবা, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি।”
হয়তো এই কথাটা আরও অনেক বছর আগে বলা উচিত ছিল।— Md Abdul Roshid - CEO,Rlink Express

0-0x0-0-0# 
0-0x0-0-0# 
0-0x0-0-0#